বৃষরূপি অরিষ্টাসুর বধের পরে ভগবান শ্রীশ্যামসুন্দর যখন গোপাঙ্গনাগনের সঙ্গে মিলিত হলেন তখন তাঁরা রহস্যপূর্ব্বক বললেন তোমার সঙ্গে আজ আমরা মিলিতে ইচ্ছা করি না ৷
শ্রীকৃষ্ণ বললেন— হে গোপাঙ্গনাগণ ৷ কেন তোমরা আমার সঙ্গে মিলিত হইতে ইচ্ছা কর না ?
শ্রীরাধা ঠাকুরাণী বললেন— হে দামোদর ৷ হে পুতনা ঘাতন ৷ তুমি বৃষাসুর বধ করিয়াছ এই হেতু ৷
কৃষ্ণ বললেন— সে তো মহা অসুর ৷
রাধারানী বললেন— অসুর হলেও বৃষের আকৃতী যেমন বৃত্রাসুর অসুর হলেও তার বধে ইন্দ্রের ব্রাহ্মন হত্যা পাপ হয়েছিল ৷ তাইজন্য তোমার গো-হত্যা পাপ হয়েছে ৷
কৃষ্ণ বললেন-- এখন এই পাপ থেকে উদ্ধারের উপায় কি করব ?
রাধা বললেন-- ত্রিভূবনের সর্বতীর্থে স্নান করলে পাপ যাবে ৷
কৃষ্ণ বললেন-- তাহলে আমি তীর্থ স্নান করতে চললাম ৷
রাধা বললেন-- আমাদের সামনে স্নান করতে হবে ৷
কৃষ্ণ তখন দক্ষিন চরণের পদাঘাতে এক কুন্ড খনন করলেন এবং সমস্ত তীর্থগণকে তথায় অহবান করলেন, প্রভূর স্মরণ মাত্র সমস্ত তীর্থ আগমন করলেন ৷ তথা স্ব স্ব নাম উচ্চারণ পূর্ব্বক ঐ কুন্ডে প্রবেশ করতে লাগলেন ৷ কৃষ্ণ তখন গোপাঙ্গনাগণকে তাহা সাক্ষাত ভাবে দেখালেন ৷
অনন্তর শ্রীকৃষ্ণ সেই কুন্ডজলে স্নান করবার পর গোপাঙ্গনাগণকে বললেন— হে ব্রজদেবীগণ ! তোমরাও এই পবিত্র তীর্থ জলে স্নান কর ৷ শ্রীকৃষ্ণের এরূপ নর্মালাপ শুনে গোপীগণ বললেন তোমার দেহস্থিত গো হত্যা পাপ উহাতে প্রবেশ করেছে অতএব ঐ জল আমরা স্পর্শ করব না ৷ আমরা স্বয়ং কুন্ড খনন করে তাতে স্নান করব ৷
অতঃপর শ্রীরাসেশ্বরী শ্রীরাধা ঠাকুরানী সখীগণ সঙ্গে বিবিধ মন্ত্রনা করবার পর স্বয়ং শ্রীচরণ আঘাতে এক কুন্ড নির্মাণ করলেন এবং ঐ কুন্ড স্বর্গ গঙ্গা মন্দাকিনীর জল দ্বারা পূর্ণ করতে মনস্থ করলেন ৷ শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের মনোভাব বুঝে বললেন- হে ব্রজদেবীগণ ৷ আমার কুন্ডের পবিত্র জলে ঐ কুন্ড পূর্ণ কর ৷ গোপীগণ বললেন— না না না তোমার কুন্ডের জল আমরা স্পর্শ করব না ৷ উহাতে গোহত্যা পাপ রয়েছে ৷ শ্রীরাধা ঠাকুরানী বলেন-- আমার ত শতকোটি গোপী আছে, স্বর্গ-গঙ্গা থেকে এক এক কলসী জল এনে এ কুন্ড পূর্ণ করব, তথাপি তোমার কুন্ডজল স্পর্শ করব না ৷ এতে আমাদের যশ পৃথিবীতে ঘোষিত হবে ৷
শ্রীরাসেশ্বরীর এ উক্তি শ্রবণে শ্রীকৃষ্ণ তৎকালে তীর্থগণকে ইঙ্গিত করলেন ৷ প্রভূর সে ইঙ্গিতে তীর্থগণ আপন আপন দেবী মূর্ত্তি প্রকট করলেন এবং সকলেই বিনীতভাবে করজোড়ে শ্রীরাসেশ্বরীর স্তব করতে লাগলেন—
হে কৃষ্ণপ্রেয়সী মুখ্যা ! হে শ্রীরাস রাসেশ্বরী ! তোমার মহামহিমা ব্রহ্মা, শিব ও নারদাদি বুঝতে পারে না ৷ হে দেবি ! তোমার শ্রীচরণ ধূলি আমাদের শিরোভূষণ হউক ৷ আমাদের প্রার্থনা নিত্যকাল তোমার শ্রীচরণতলে স্থান পাই ৷ হে শ্রীরাধে ! তোমার শ্রীচরণ আঘাতে নির্ম্মিত পবিত্র কুন্ডে আমরা স্থান লাভ করিতে পারি, এ আশারূপী তরু পল্লবীত হউক ৷
তীর্থগণের এরূপ কাতর প্রার্থনায়, শ্রীরাধা ঠাকুরাণী তাদের সে বাসনা পূর্ণ করলেন, তৎক্ষনাৎ তীর্থগণ শ্যামকুন্ডের তীরভূমি ভেদ করে রাধাকুন্ডে প্রবেশ করলেন ৷
অতঃপর শ্রীকৃষ্ণ বললেন— হে রাসেশ্বরী ! আমার কুন্ড হতে তোমার কুন্ডের মহিমা অধিক ৷ তুমি যেমন আমার প্রিয় তেমনি তোমার কুন্ডও আমার পরম প্রিয় ৷ আমি তোমা হতে তোমার কুন্ডকে ভেদ দর্শন করি না ৷ তোমার নামে এ কুন্ড 'শ্রীরাধাকুন্ড' নামে চিরকাল খ্যাতি লাভ করবে ৷
ভগবান নিত্য শ্রীরাধাকুন্ড ও শ্যামকুন্ডের মনোহর তটভূমিতে বিহার করে থাকেন ৷
কুন্ড মাহাত্ম্য = আদি বরাহ পুরাণে কথিত হয়েছে - রাজসূয় ও অশ্বমেধাদি মহা মহা যজ্ঞ সকল অনুষ্ঠানে যে ফল পাওয়া যায়, তদপেক্ষা শতগুণ ফল অরিষ্টকুন্ড বা শ্যামকুন্ড ও শ্রীরাধাকুন্ড স্নানে লাভ হয়ে থাকে ৷ ইহাতে কোন সন্দেহ নাই ৷
পদ্মপুরাণে বর্নিত আছে -- শ্রীহরির প্রিয় রাধাকুন্ড, রমণীয় শ্রীগোবর্দ্দন পর্ব্বতের মধ্যে বিরাজিত ৷ কার্ত্তিক মাসের কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে শ্রীরাধাকুন্ডে স্নান করলে , লোক রাধাকুন্ড বিহারী শ্রীহরির প্রিয় ভক্ত হতে পারে ৷ কারন তাহাতে শ্রীহরির অত্যন্ত তোষণ হয় ৷ রাধা যেরূপ শ্রীকৃষ্ণের প্রিয়, শ্রীরাধা কুন্ডও তদ্রূপ প্রিয় ৷ কেননা সকল গোপীগণ মধ্যে একা রাধাই শ্রীহরির অতিপ্রিয় ৷ কার্তিক মাসে শ্রীরাধাকুন্ডে স্নান করে জনার্দ্দনকে পূজা করা কর্ত্তব্য ৷ জনার্দ্দন উত্থান একাদশীতে পূজিত হলে যেরূপ প্রীত হন, এ দিনের পূজাতেও সেরূপ প্রীত হন ৷
৷৷ " জয় রাধে জয় কৃষ্ণ "
" জয় রাধা কুন্ড জয় শ্যাম কুন্ড " ৷৷

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন